বিশ্বকাপ শেষ, এবার ছেলেগুলো কোথায় যাবে?
বিশ্বকাপ শেষ হলে ছেলেগুলো কোথায় যাবে? মানে, বাড়ি তো ফিরবে। কেউ মণিপুরে, কেউ মিজোরামে, কেউ দেশের অন্য কোনও প্রান্তে। মা-বাবার সঙ্গে দেখা হবে। বন্ধুরা ঘিরে ধরবে। পাড়ায় একটু হইচই হবে। হয়তো কোনও সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দেবে। তারপর? পরের সোমবার সকালে ওরা কোথায় ফুটবল খেলতে যাবে? প্রশ্নটা শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোর একটা লুকিয়ে রয়েছে এই সাধারণ প্রশ্নের মধ্যেই।
– সৌমদীপ পাল
আজারবাইজানে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলারদের দুরন্ত পারফরম্যান্স, ইউরোপের স্বপ্ন আর আমাদের ফুটবলের পুরোনো অসুখ । ফুটবলে একটা বড় মুশকিল আছে। ম্যাচ শেষ হলে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে দেন। গ্যালারি ফাঁকা হয়, মাঠের আলো নিভে যায়। কিন্তু একটা ফুটবলারের জীবন তো আর রেফারির বাঁশিতে থেমে থাকে না। সেখানে খেলা চলতেই থাকে। কখনও মাঠে, কখনও মাঠের বাইরে। কখনও বল পায়ে, কখনও চুক্তির কাগজে।
আজারবাইজানে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলারদের খেলা আর ফলাফল দেখতে দেখতে এই কথাটাই বারবার মনে হচ্ছে। ৬টা ম্যাচ। তিনটে জয়, একটা ড্র, দুটো হার। পনেরোটা গোল। ক্যামেরুনকে হারানো, বাহরিনের বিরুদ্ধে চার গোল, লাওসের বিরুদ্ধেও চার গোল।
ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান অবস্থার কথা মাথায় রাখলে, পনেরো বছরের ছেলেগুলোর এই পারফরম্যান্সকে ছোট করে দেখার কোনও জায়গা নেই। বিশেষ করে ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে ২-১ জয়টা।
আফ্রিকান ফুটবলের শক্তিশালী ঐতিহ্যের একটা দেশের বিরুদ্ধে ভারতীয় কিশোরদের জয়। তার উপর সেই ক্যামেরুনই শেষ পর্যন্ত গ্রুপের শীর্ষে শেষ করেছে। অর্থাৎ, ভারত যে শুধু অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গোল করে এসেছে, ব্যাপারটা তেমন নয়। সেনেগালের কাছে শেষ ম্যাচে ৬-১ গোলে হারতে হয়েছে। সেই হারটাও বড়। কিন্তু একটা হারের জন্য আগের চার ম্যাচের ভালো ফুটবল মুছে ফেলার কোনও মানে হয় না। বরং সেনেগালের ম্যাচটা আমাদের অনেক কিছু শেখাতে পারে।
ছয় ম্যাচে ভারত ১৫ গোল করেছে। আবার হজম করেছে ১৭ গোল। আক্রমণে সাহস আছে, গোল করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু রক্ষণে সমস্যা আছে। ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতি সামলানোর জায়গায় আরও কাজ দরকার। অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে, এই প্রতিযোগিতা আটজনের ফুটবল। ছোট মাঠ, কম সময়ের ম্যাচ। এখানকার গোলের হিসেব সরাসরি এগারোজনের ফুটবলের সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। তবু একটা জিনিস স্পষ্ট। ছেলেগুলো ফুটবল খেলতে জানে। আর সেই কারণেই একটা প্রশ্ন মাথা থেকে সরছে না।
বিশ্বকাপ শেষ হলে ছেলেগুলো কোথায় যাবে? মানে, বাড়ি তো ফিরবে। কেউ মণিপুরে, কেউ মিজোরামে, কেউ দেশের অন্য কোনও প্রান্তে। মা-বাবার সঙ্গে দেখা হবে। বন্ধুরা ঘিরে ধরবে। পাড়ায় একটু হইচই হবে। হয়তো কোনও সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দেবে। তারপর? পরের সোমবার সকালে ওরা কোথায় ফুটবল খেলতে যাবে? প্রশ্নটা শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোর একটা লুকিয়ে রয়েছে এই সাধারণ প্রশ্নের মধ্যেই। দশ পয়েন্ট পেয়েও তৃতীয়! এই বিশ্বকাপে ভারতের গ্রুপ পর্বের ফলাফলটা একটু ভালো করে দেখা দরকার। লাওসকে ৪-২, ক্যামেরুনকে ২-১, গ্রেনাডার সঙ্গে ৩-৩ ড্র, বাহরিনকে ৪-৩। তারপর সেনেগালের কাছে ১-৬ হার। সব মিলিয়ে দশ পয়েন্ট। অথচ গ্রুপে তৃতীয়। ক্যামেরুন আর সেনেগাল দুটো দলই বারো পয়েন্ট নিয়ে ভারতের উপরে শেষ করেছে। ফলে ভারতকে খেলতে হল Tier C-তে।
এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। যে ক্যামেরুন গ্রুপের শীর্ষে শেষ করল, তাদেরই হারিয়েছে ভারত। অথচ গ্রুপের শেষ ম্যাচের ফলাফল আর পয়েন্টের অঙ্ক ভারতকে তৃতীয় স্থানে নামিয়ে দিয়েছে। এটাই ফুটবল। একদিন যে দলকে হারানো যায়, অন্যদিন তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের প্রতিপক্ষের কাছে বড় ব্যবধানে হারতে হতে পারে। বিশেষ করে এই বয়সে।
পনেরো বছরের একটা ছেলে এখনও শিখছে কীভাবে ম্যাচের গতি বুঝতে হয়, কখন আক্রমণে উঠতে হয়, কখন একটু ধৈর্য ধরে খেলতে হয়। সেনেগালের বিরুদ্ধে হারটা তাই শুধু হতাশার নয়। এটা একটা শিক্ষাও।
কোথায় আমাদের ডিফেন্সিভ পজিশনিংয়ে সমস্যা হচ্ছে, কখন মাঝমাঠের সঙ্গে রক্ষণের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে, চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে কতটা সময় লাগছে—এসব বোঝার সুযোগ। আর ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে জয়টা মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই ছেলেদের মধ্যে সম্ভাবনাও কম নেই। লালরেমরুয়াতফেলার পাঁচ গোল, ম্যাকডনিশের তিন গোল—ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিক থেকেও নজর দেওয়ার মতো কিছু নাম উঠে এসেছে। কিন্তু এই নামগুলো যেন শুধু একটা টুর্নামেন্টের পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে। পাঁচ বছর পরে যেন আবার তাদের খুঁজতে না হয়।বিশ্বকাপের সাতদিন, তারপর সাতশো দিন
FIFA-র এই অনূর্ধ্ব-১৫ প্রতিযোগিতার একটা বিশেষত্ব রয়েছে। প্রচলিত এগারোজনের ফুটবলের বদলে আটজনের দল, ছোট মাঠ, কম সময়ের ম্যাচ। উদ্দেশ্যটা বেশ ভালো। ছোট মাঠে প্রত্যেক ফুটবলার বেশি বার বল পায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কম থাকে। প্রতিপক্ষের চাপ আসে দ্রুত। একজন মিডফিল্ডার বল পাওয়ার আগে কতবার মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ দেখছে, একজন ডিফেন্ডার চাপের মুখে বলটা কোথায় পাঠাচ্ছে, একজন ফরোয়ার্ড জায়গা তৈরি করতে কতটা বুদ্ধি খাটাচ্ছে—এসব বোঝার বেশ ভালো সুযোগ। First Touch, Ball Control, Spatial Awareness, Press Resistance, Decision Making—সবকিছুরই পরীক্ষা হয়।
তবে একটা কথা মাথায় রাখা দরকার। আটজনের ফুটবলে দুর্দান্ত খেললেই যে সেই ছেলে পাঁচ বছর পরে এগারোজনের পেশাদার ফুটবলেও দুর্দান্ত খেলবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। বড় মাঠে খেলার হিসেব অনেকটাই আলাদা। সেখানে পজিশনিং, অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট, ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশন, শারীরিক সক্ষমতা—সবকিছুর পরীক্ষাই আরও কঠিন। তাই এই বিশ্বকাপকে প্রতিভা চেনার একটা জানালা বলা যায়। প্রতিভার শেষ পরীক্ষা নয়। কিন্তু জানালাটা খুলে যাওয়ার পর আমরা কী করব? এটাই আসল প্রশ্ন।
কারণ একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাতদিন ভালো ফুটবল খেলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, পরবর্তী সাতশো দিনে সেই ফুটবলার কতটা ভালো ফুটবলার হয়ে উঠল। আর সেখানেই আমাদের সমস্যার শুরু। দেশে ফিরে খেলবে কোথায়?
ভারতে বয়সভিত্তিক ফুটবল একেবারেই নেই, এমন নয়। AIFF-এর Youth League রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য সংস্থা, ক্লাব এবং অ্যাকাডেমিও প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। কিন্তু পনেরো-ষোলো বছরের ছেলেদের জন্য সারা বছর ধরে চলা, নিয়মিত ম্যাচের নিশ্চয়তাসম্পন্ন, দেশজোড়া একটা সুসংহত U-15 কিংবা U-16 লিগ ব্যবস্থা করা। একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করা আর একটা ফুটবল লিগ তৈরি করা এক জিনিস নয়।
ধরা যাক, একটা ছেলে বছরে কয়েকটা প্রতিযোগিতা খেলল। তারপর মাসের পর মাস অনুশীলন করল। মাঝে কয়েকটা প্র্যাকটিস ম্যাচ পেল। এতে তার ফুটবল কতটা এগোবে? অনুশীলন অবশ্যই দরকার। কিন্তু ম্যাচের বিকল্প অনুশীলন নয়।
মাঠে প্রতিপক্ষ যখন সত্যি সত্যি বল কেড়ে নিতে আসছে, স্কোরলাইন যখন বিপক্ষে, শেষ পাঁচ মিনিটে যখন একটা গোল করতেই হবে—সেই পরিস্থিতিতে ফুটবলার যে শিক্ষা পায়, সেটা শুধু ট্রেনিং গ্রাউন্ডে শেখানো যায় না। একজন পনেরো বছরের ফুটবলারের দরকার নিয়মিত ম্যাচ। দরকার নিজের বয়সের ভালো প্রতিপক্ষ। দরকার নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ। আর দরকার একটা পরিষ্কার রাস্তা।
U-15 থেকে U-17, সেখান থেকে U-19, তারপর সিনিয়র ফুটবল। আমাদের এখানে এই রাস্তাটাই অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। আজ যে ছেলেটা জাতীয় দলের হয়ে ক্যামেরুনকে হারিয়েছে, দুবছর পরে সে নিয়মিত কতগুলো ম্যাচ খেলবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? কোন ক্লাব তার উন্নতির দায়িত্ব নেবে? কোন কোচ তাকে পরের ধাপের জন্য তৈরি করবেন? আর যদি সেই ছেলে কোনও বড় ক্লাবের অ্যাকাডেমিতে থেকেও নিয়মিত খেলার সুযোগ না পায়? তাহলে?
ফুটবলার তৈরি করতে গেলে শুধু প্রতিভা খুঁজে বের করলেই হয় না। প্রতিভাটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হওয়ার জায়গাও দিতে হয়। একটা গাছ লাগিয়ে তারপর তিন মাস জল না দিয়ে বসে থাকলে গাছটার দোষ দেওয়া চলে না। ফুটবলের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা মোটামুটি একই। পনেরো বছর বয়সে কেউ সম্পূর্ণ ফুটবলার নয়।
আমাদের আরও একটা বদভ্যাস আছে। কোনও ছেলে বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় ভালো খেললেই আমরা তাকে ভবিষ্যতের তারকা বানিয়ে ফেলি। একটা ভালো ড্রিবল করলেই নতুন মেসি। দুটো গোল করলেই নতুন সুনীল ছেত্রী। তারপর দুবছর বাদে ছেলেটার নাম আর মনে থাকে না। কিন্তু পনেরো বছর বয়সে একজন ফুটবলারকে বিচার করাটাই খুব কঠিন। এই বয়সে সবার শারীরিক বিকাশ একরকম হয় না। কেউ দ্রুত লম্বা হয়, শক্তিশালী হয়। কেউ একটু দেরিতে। যে ছেলেটা আজ গতি আর শক্তিতে সবাইকে পিছনে ফেলছে, তিন বছর পরে হয়তো সেই সুবিধাটা আর থাকবে না। আবার আজ যে ছেলেটা একটু রোগা, একটু ধীর, সে হয়তো আঠারো বছর বয়সে অসাধারণ ফুটবল-বুদ্ধির পরিচয় দেবে।
সেই জন্যই উন্নত Youth Development System শুধু আজকের সেরা এগারোজনকে খুঁজে বেড়ায় না। খুঁজে বেড়ায় কার কতটা উন্নতি করার ক্ষমতা রয়েছে। কেউ আজ ভালো খেলছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে কত তাড়াতাড়ি নতুন কিছু শিখছে, ভুল থেকে কতটা উন্নতি করছে, চাপের মুখে কেমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।একটা পনেরো বছরের ছেলের ফুটবলজীবন নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। বরং তার সামনে যত বেশি সম্ভব ভালো ফুটবল খেলার সুযোগ তৈরি করার সময় এসেছে ইউরোপের দরজা কি খুলতে পারে?
এবার আসা যাক আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথায়। আজারবাইজানে ভারতের কোনও ফুটবলার অসাধারণ খেলল। কোনও ইউরোপীয় স্কাউটের চোখে পড়ল। তারপর কী? অনেকেই ভাবেন, কোনও ইউরোপীয় ক্লাব পছন্দ করলেই ছেলেটাকে নিয়ে চলে যাবে। অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দেবে। তারপর একদিন সে বড় দলের হয়ে খেলবে। ব্যাপারটা এত সহজ নয়। FIFA-র নিয়ম অনুযায়ী, আঠারো বছরের কম বয়সি ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে ষোলো থেকে আঠারো বছরের ফুটবলারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ভারত থেকে সরাসরি ইউরোপে যেতে চাওয়া কোনও ফুটবলার সাধারণত সেই সুবিধা পাবে না। অর্থাৎ, Real Madrid কিংবা Ajax-এর কোনও স্কাউট পনেরো বছরের ভারতীয় ফুটবলারকে পছন্দ করলেই তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দলে রেজিস্টার করিয়ে ফেলতে পারবেন না। তবে বিদেশে যাওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা বন্ধ, সেটাও নয়।
নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, অনুমোদিত Trial, Scouting Assessment কিংবা ভবিষ্যতের ট্রান্সফার নিয়ে আলোচনা সম্ভব হতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বয়স, অভিভাবকের সম্মতি, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং FIFA-র বিধিনিষেধ মানতে হবে।
আর একটা কথা মনে রাখা দরকার। বিদেশের কোনও অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া আর সেই দেশের ক্লাবের হয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় খেলার অনুমতি পাওয়া এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটা না বুঝলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। কিন্তু আসল সমস্যাটা শুধু FIFA-র নিয়ম নয়। সমস্যা হল, সেই নিয়ম মেনে বিদেশে যাওয়ার বয়স হওয়া পর্যন্ত আমরা ছেলেটাকে কীভাবে তৈরি করব?
Endrick-এর গল্পটা একটু মনে করা যাক। ২০২২ সালে মাত্র ষোলো বছর বয়সে ব্রাজিলের Endrick-কে নেওয়ার চুক্তি করে Real Madrid। কিন্তু Endrick সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রিদে চলে যাননি। তিনি ব্রাজিলেই থেকে যান। Palmeiras-এর হয়ে পেশাদার ফুটবল খেলতে থাকেন। নিয়মিত ম্যাচ খেলেন। বড়দের ফুটবলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকেন। আঠারো বছর বয়স হওয়ার পরে ২০২৪ সালে তিনি Real Madrid-এ যোগ দেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা তাঁর ট্রান্সফারের টাকার অঙ্ক নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, ষোলো থেকে আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত Endrick কোথায় ফুটবল খেলছিলেন। তিনি খেলছিলেন ব্রাজিলের প্রতিযোগিতামূলক পেশাদার ফুটবলে।
এবার একই প্রশ্ন ভারতের কোনও প্রতিভাবান ছেলেকে নিয়ে করা যাক। ধরা যাক, আজারবাইজানে তাকে কোনও ইউরোপীয় ক্লাব পছন্দ করল। ভবিষ্যতে তাকে নেওয়ার আগ্রহও দেখাল। কিন্তু ছেলেটার বয়স এখনও পনেরো। তাহলে আগামী তিন বছর সে কোথায় খেলবে? কোন মানের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলবে? কতগুলো ম্যাচ খেলবে? কী ধরনের কোচিং পাবে? কোনও ইউরোপীয় ক্লাব যদি তিন বছর পরে আবার তার খেলা দেখতে আসে, তখন কি আজকের ছেলেটার চেয়ে ভালো একজন ফুটবলারকে দেখতে পাবে? নাকি দেখবে, পনেরো বছর বয়সে যে সম্ভাবনা ছিল, সেটা আর তেমন এগোয়নি?
এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে আন্তর্জাতিক স্কাউটের নজরে আসার সুযোগটা কতটা কাজে লাগানো গেল। ইউরোপ মানেই শুধু পাঁচটা বড় লিগ নয়। আমাদের এখানে ইউরোপীয় ফুটবল বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে Real Madrid, Barcelona, Manchester City, Bayern Munich। যেন এই ক্লাবগুলো ছাড়া ইউরোপে আর ফুটবল হয় না। অথচ বাস্তবটা অনেক বড়। Portugal, Belgium, Netherlands, Germany-র বিভিন্ন স্তরের ক্লাব কিংবা ইউরোপের আরও অনেক দেশের Development-oriented Club তরুণ ফুটবলারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে। সব ক্লাবের সুযোগ-সুবিধা এক নয়। সব লিগের মানও এক নয়। কিন্তু একটা ভালো ছোট ক্লাবে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ কখনও কখনও বড় ক্লাবের অ্যাকাডেমিতে বেঞ্চে বসে থাকার চেয়ে অনেক বেশি উপকারী হতে পারে।
অবশ্যই বিদেশে খেলার ক্ষেত্রে ভিসা, কাজের অনুমতি, Non-EU Player Rules এবং ক্লাব রেজিস্ট্রেশনের নানা শর্ত রয়েছে। ইংল্যান্ডের নিয়ম আর পর্তুগালের নিয়ম এক নয়। তাই শুধু ‘ইউরোপে পাঠাব’ বললেই হয় না। কোথায় পাঠাব? কেন পাঠাব? সেখানে ছেলেটা কী শিখবে? কতটা খেলতে পারবে? পাঁচ বছর পরে তার সামনে কী রাস্তা খুলতে পারে? এসবের উত্তর থাকা দরকার।
আর এই জায়গাতেই একজন ভালো ফুটবল এজেন্টের প্রয়োজন হতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিপদটাও শুরু হতে পারে ঠিক এখান থেকে। স্বপ্নের দালাল আর পনেরো বছরের ফুটবলার ফুটবলে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। মাঠে এগারোজন খেললেও মাঠের বাইরে আরও অনেকের খেলা চলে। সেখানে বল নেই, গোলপোস্ট নেই। আছে চুক্তির কাগজ, টাকার অঙ্ক আর নানারকম প্রতিশ্রুতি। আর সেই খেলাটা সবসময় খুব পরিষ্কার হয় না।
ধরা যাক, আজারবাইজান থেকে ফিরেছে পনেরো বছরের একটা ছেলে। বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলেছে। বল পায়ে অসম্ভব স্বচ্ছন্দ। মাথা তুলে পাস দিতে জানে। বয়সের তুলনায় ফুটবল-বুদ্ধিটাও বেশ পাকা। স্বাভাবিকভাবেই তাকে নিয়ে একটু হইচই শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই হাজির হলেন এক ভদ্রলোক। নিজেকে ফুটবল এজেন্ট বলে পরিচয় দিলেন। ইউরোপের কয়েকটা ক্লাবের নাম বললেন, দু-একজন বড় ফুটবলারের সঙ্গে নিজের ছবি দেখালেন।
তারপর ছেলেটির বাবাকে একদিন ডেকে বললেন, ‘দেখুন, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি বলেই বলছি। ইউরোপ-টিউরোপের চক্করে পড়ে লাভ নেই। ওখানে খেলতে দেবে না, পয়সাও পাবেন না। তার চেয়ে এখানকার বড় ক্লাবে ঢুকিয়ে দিই। ভালো টাকা পাবেন। ছেলের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত।’শুনতে কথাগুলো বেশ যুক্তিসঙ্গত। আর বিপদটাও ঠিক সেখানেই।
ইউরোপে গিয়ে যে সবাই সফল হয়, এমন নয়। বিদেশের কোনও অ্যাকাডেমিতে নাম লেখালেই যে পরদিন থেকে প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়া যায়, তাও নয়। ভাষার সমস্যা আছে, ভিসার ঝামেলা আছে, ফুটবলের মানের বিরাট তফাত আছে। তার উপর অপ্রাপ্তবয়স্ক ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার নিয়ে FIFA-র কড়া নিয়ম। কাজেই ছেলেটিকে বিদেশে পাঠানোর আগে দশবার ভাবা উচিত। তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
কিন্তু সেই দশবার ভাবার কাজটা কে করছেন? ছেলেটির ভালোর জন্য ভাবছেন, নাকি নিজের পকেটের জন্য? ধরা যাক, ভারতের কোনও বড় ক্লাবে ছেলেটির চুক্তি করিয়ে দিলে এজেন্টের হাতে এখনই কিছু টাকা আসবে। অন্যদিকে বিদেশের কোনও ছোট ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা—এসবের মধ্যে পরিশ্রম বেশি, অনিশ্চয়তাও বেশি। তাৎক্ষণিক লাভের নিশ্চয়তা কম। তখন এজেন্টের কাছে ভারতীয় ক্লাবের প্রস্তাবটাই বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। অথচ ছেলেটির জন্য কোনটা ভালো, সেই হিসেবটা হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ভারতীয় ক্লাবে খেলা কোনও অপরাধ নয়। বরং ভালো কোচিং, নিয়মিত ম্যাচ আর সিনিয়র দলে ওঠার সুযোগ থাকলে নিজের দেশেই থেকে একজন ফুটবলার চমৎকার উন্নতি করতে পারে। আবার ইউরোপে গেলেই যে ফুটবলার তৈরি হয়ে যাবে, এমন ভাবাও বোকামি। সমস্যা দেশ নিয়ে নয়। সমস্যাটা সুযোগ নিয়ে।
একটা ছেলে যদি ভারতে থেকে বছরে হাতে গোনা কয়েকটা ম্যাচ খেলে, আর অন্য কোথাও নিয়মিত ভালো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পায়, তাহলে অন্তত সেই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা খতিয়ে দেখা দরকার। উল্টোটাও সত্যি। ইউরোপের কোনও নামী ক্লাবের অ্যাকাডেমিতে বসে থাকার চেয়ে ভারতের কোনও ভালো ক্লাবে নিয়মিত ফুটবল খেলা অনেক বেশি কাজে আসতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার অধিকার কার? ছেলেটির। তার পরিবারের। আর অবশ্যই সেই মানুষগুলোর, যাঁরা সত্যিই তার ফুটবলটা বোঝেন। এজেন্টের কমিশনের অঙ্কের নয়। যখন এজেন্টের কমিশন বড় হয়ে ওঠে ফুটবলারের ভবিষ্যতের চেয়ে এজেন্টদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত একটা বিপদের কথাই ভাবি।
কেউ হয়তো ইউরোপের কোনও বড় ক্লাবে ট্রায়াল দেওয়ানোর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিলেন। বিদেশে পাঠানোর নামে টাকা নিলেন। তারপর একদিন ফোন বন্ধ করে উধাও হয়ে গেলেন। এমন প্রতারণার আশঙ্কা অবশ্যই আছে।
কিন্তু আরও একটা বিপদ রয়েছে। সেটা একটু কম চোখে পড়ে। কোনও কোনও অসাধু এজেন্ট হয়তো ছেলেটাকে বিদেশে পাঠাতেই চাইবেন না। কেন? কারণ বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে সময় লাগে। যোগাযোগ রাখতে হয়। নিয়মকানুন বুঝতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয় আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত। অন্যদিকে দেশের কোনও বড় ক্লাবে চুক্তি করিয়ে দিতে পারলে দ্রুত আর্থিক লাভের সুযোগ থাকতে পারে। তখন ছেলেটার সামনে ইউরোপের কোনও বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা থাকলেও এজেন্ট সেটাকে গুরুত্ব না-ও দিতে পারেন। বরং বোঝাতে পারেন, ‘ইউরোপে গিয়ে কী হবে? ওখানে তোমাকে খেলাবে না। পয়সাও দেবে না। এত ঝুঁকি নিয়ে লাভ কী? এখানে বড় ক্লাবের অফার আছে, ভালো টাকা আছে। সেটাই নাও।’ কথাগুলো পুরোপুরি মিথ্যে নয়। বিদেশে খেলার সুযোগ পাওয়া সত্যিই কঠিন। প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়া আরও কঠিন। আর্থিক অনিশ্চয়তাও থাকতে পারে। কিন্তু অর্ধেক সত্যি কখনও কখনও পুরো মিথ্যের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ ছেলেটা হয়তো জানতেই পারল না, তার সামনে অন্য একটা পথও খোলা ছিল।
হয়তো কোনও ছোট ইউরোপীয় ক্লাব ভবিষ্যতে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে চেয়েছিল। হয়তো কোনও ভালো Development Programme-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। হয়তো এমন একটা প্রশিক্ষণব্যবস্থা পাওয়া যেত, যেখানে তার ফুটবলটা আরও ভালোভাবে গড়ে উঠতে পারত। আবার এটাও হতে পারে, দেশের কোনও ক্লাবই তার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটা অন্তত সমস্ত সম্ভাবনা বিচার করে নেওয়া উচিত। এজেন্টের কমিশনের হিসেব মেনে নয়। এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে। পনেরো বছরের একটা ফুটবলারের কাছে আজকের টাকার অঙ্কটাই সব নয়।
ধরা যাক, একটা ছেলে দেশের কোনও বড় ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করল। ভালো টাকা পেল। কিন্তু পরবর্তী তিন বছর নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেল না।অন্যদিকে আরেকটা ছেলে তুলনায় কম আর্থিক সুবিধা নিয়ে এমন একটা পরিবেশে থাকল, যেখানে ভালো কোচিং পেল, নিয়মিত ম্যাচ খেলল, নিজের দুর্বলতাগুলো শুধরে নিল। একুশ বছর বয়সে কে বেশি ভালো ফুটবলার হয়ে উঠবে?








