গ্রেনেড টু গ্রেটেস্ট - ঝুঁকা নেহি 'লুকা'
সেই রাখাল শিশুটিই আজকের লুকা মদরিচ। ক্রোট ফুটবলের অন্যতম সেরা উপহার। সেরা ট্যালেন্ট। সেরা অহঙ্কার।

অর্কদ্যুতি রায় ( অতিথি লেখক)
পাহাড়ের কোলে ইতিউতি বিছানো ল্যান্ড মাইন। কখনও সখনও সে সব ফেটে প্রাণ যায় কোনও গরু কিংবা ভেড়ারও। অথচ পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তে ছোট্ট শিশুটি অবলীলায় হাঁটছে।
নয়-এর দশকের গোড়ার কথা। বয়স তখন কতই বা! চার-পাঁচ হবে। অনটনের সংসার। হাতে ভেড়ার দড়ি নিয়ে যুগোস্লাভিয়ার বলকান অঞ্চলে এই পাহাড় থেকে ওই পাহাড়, এই ভ্যালি থেকে ওই ভ্যালি; মেষপালক শিশুটি হাঁটছে। শুধু হাঁটছে। কখনও বসছে। আবার হাঁটছে। জীবনের পরোয়া করতে শেখেনি। অভাবে, দারিদ্রে, আতঙ্কে সেই মেষপালক শিশুটির কাছে সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না যে!
সেই রাখাল শিশুটিই আজকের লুকা মদরিচ। ক্রোট ফুটবলের অন্যতম সেরা উপহার। সেরা ট্যালেন্ট। সেরা অহঙ্কার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের পতন হয়। তখন থেকে ক্রোয়েশিয়ার শাসনভার যুগোস্লাভিয়ার হাতে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ক্রোয়েশিয়া সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়ার একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ক্রোটদের উপরে অত্যাচারের তীব্রতা বাড়ে। শুরু হয় স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে অবশেষে ১৯৯১ সালে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয় ক্রোয়েশিয়ার আকাশে। যদিও সার্বিয়া শাসিত যুগোস্লাভিয়া মেনে নেয়নি ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা। ফের শুরু হয় স্বাধীনতার পরেও স্বাধীনতার যুদ্ধ। স্থানীয় সার্বিয়ান সেনাকে সঙ্গে নিয়ে ক্রোয়েশিয়া আক্রমণ করে যুগোস্লাভিয়া। বিদেশি শক্তির হাত থেকে দেশকে দখলমুক্ত করতে টানা চার বছর যুদ্ধ করে ক্রোট বাহিনী। অবশেষে ১৯৯৫ সালে পিছু হঠতে বাধ্য হয় প্রতিপক্ষ। ক্রোয়েশিয়ার সেনাবাহিনী সেই যুদ্ধের নাম দিয়েছিল 'অপারেশন স্টর্ম।'
কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষের মতোই স্বাধীনতার এ লড়াই সহজ ছিল না ক্রোটদের। বড় কঠিন ছিল ওই রাখাল শিশুটির পরিবারের অবস্থাও। পরাধীন ক্রোয়েশিয়ার ডালমিটিয়া অঞ্চলের ভেলেবিট পাহাড়ের কোলঘেঁষে ছোট্ট গ্রাম 'মদরিচি'। সেখানেই জন্ম লুকার। ওর মা ও বাবা দু'জনেই কাজ করতেন স্থানীয় একটি কারখানায়। সংসারে লুকার দুই বোন ও পিতামহও থাকতেন একসঙ্গে। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। তারসঙ্গে দেশ জুড়ে স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। ভারী বুট, গুলি, বোমা, মৃত্যুমিছিল। এ সবের সঙ্গেই জীবন কাটছিল মদরিচ পরিবারের। আতঙ্ক, হতাশা, অন্ধকার - বেড়েই চলেছে। জীবন দুর্বিষহ যখন চরমতম আঘাত নেমে আসে পরিবারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত পাহাড়ের বুকে লুকার দাদু খুন হয়ে যান মিলিশিয়াদের হাতে। ভেঙে গুঁড়িয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ওদের বাড়ি। একটা বাসনও সেই ঘর থেকে বের করতে পারেনি মদরিচরা। আশঙ্কা ছিল, আর কিছুক্ষণ ওখানে থাকলে হয়তো খুন হয়ে যাবে গোটা পরিবার-ই। সপরিবারে ভেলেবিট পাহাড় থেকে নেমে এসে ওঁরা আশ্রয় নেন এক হোটেলের পার্কিংয়ে। ছেঁড়া কাপড় বিছিয়ে, দু'টি গাড়ির মধ্যিখানে একফালি জায়গায় ছোট্ট ছেলেকে মদরিচ দম্পতি লুকিয়ে রাখেন। সেটিই ছিল শরনার্থী শিবির। নিহত দাদুর নামেই মদরিচ দম্পতি ছেলের নাম রাখেন 'লুকা।'
ধীরে ধীরে শান্ত হয় চারপাশ। তবুও শরনার্থী শিবিরেই থাকতে হয় মদরিচদের। জল নেই, খাবার নেই, বিদ্যুৎ নেই। গ্রেনেড, মাইনের আক্রোশে ক্ষতবিক্ষত চারপাশ। প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন যুদ্ধে। স্বাধীনতার পরেও ক্রোয়েশিয়ার আরও চার বছর লেগে যায় স্বাভাবিক হতে। ইতিমধ্যেই লুকার বাবা স্ত্রিপে মদরিচ যোগ দেন ক্রোয়েশিয়ান সেনাবাহিনীতে। সেখানে এরোমেকানিকের কাজ করতেন তিনি। মা রাদোইকা দোপুদ আর তিন ছেলেমেয়ে, এক ছোট্ট সংসার।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ক্রোটরা মনে করত, ফুটবলই পারে তাদের অক্সিজেন জোগাতে। সেই নেশায় পার্কিং লটে থাকাকালীন বল পায়ে নেমে পড়ত লুকাও। ধীরে ধীরে জাদারের অলিতে গলিতে ফুটবল খেলে টুকটাক রোজগারও হয়ে যেত।
সেই শুরু।
কিন্তু কিছুতেই ভাল কোনও ক্লাবে জায়গা হচ্ছিল না লুকার। অতিরিক্ত রোগা ও দুর্বল শারীরিক গঠনের জন্য ক্রোয়েশিয়ার জনপ্রিয় ক্লাব 'হায়দুক স্প্লিট' ওকে নিতে অস্বীকার করে। যেন আরও জেদ চাপে লুকার। কিন্তু শরনার্থী শিবির হিসেবে হোটেলের সেই পার্কিং লটে যখন ফুটবল খেলত ছোট্ট লুকা, তখনই তা নজরে এসেছিল সেই হোটেলের ম্যানেজারের। তিনি আবার জাদারের এক জনপ্রিয় ক্লাবের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অবশেষে তাঁর সহায়তায় জাদারের ক্লাব 'দিনামো জাগরেব' তাদের যুব দলে নিয়ে নেয় মদরিচকে। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্লাবের প্রধান তোমিস্লাভ বাসিচ স্বপ্ন দেখতেন, এই ছেলে একদিন বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে নিজের নাম খোদাই করবে। তাই এই প্রতিভাকে বুক দিয়ে আগলে রাখেন তিনি। লুকার থাকা, খাওয়া, শরীরে পুষ্টি বাড়ানোর জন্য নিয়মিত চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ; সবকিছু করেন বাসিচ। কাঠ দিয়ে শিনগার্ড তৈরি করে তিনি ফুটবলের প্রশিক্ষণ দিতেন লুকাকে। আর লুকাও চাইত তার স্বপ্নের নায়ক ইতালির ফ্রান্সেসকো তোত্তির মতো ফুটবল খেলতে।
২০০৩ সাল। জাদারের ক্লাব থেকে অভিজ্ঞতার জন্য বসনিয়ার 'জ্রিনিস্কি মোস্তারে' ক্লাবে লিয়েনে গেলেন মদরিচ। বয়স তখন সতেরো। সেখানেই লিগের সেরা ফুটবলারের খ্যাতি অর্জন করেন এই মিডফিল্ডার।
ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘরছাড়া হন প্রায় তিন লাখেরও বেশি মানুষ। গ্রেনেড-আতঙ্ক আর ফুটবল জীবনের মধ্যিখানে যেটুকু সময় ছিল, তার সবটাই ছিল স্বপ্ন। আসলে লুকা মদরিচ সেই ফুটবলার, যিনি ক্রোটদের বুঝিয়ে ছেড়েছেন, বারুদের ভয় থেকে ভালবাসার অঙ্গীকারে কী ভাবে মিশে থাকে ফুটবল। ফুটবলীয় একটা যাত্রাপথ।
যে পথ ভরে ছিল ল্যান্ড মাইনে, সে পথে মুক্তির সূর্য ওঠে গোলাপের সুবাসে।
হ্যাঁ, সেই গোলাপটিই আজ ফের ঝরে গেল বিশ্বকাপের বিশ্বযুদ্ধ থেকে। রেখে গেল বহু বহুকিছু। ২০১৮, ২০২২-এর বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার ফাইনাল, সেমিফাইনাল। সে গোলাপে মেখে থাকে লুকা মদরিচের ব্যালন ডি'অর, টটেনহ্যাম, রিয়াল মাদ্রিদের সোনারোদ।
২০০৬ থেকে ২০২৬; প্রায় দু'দশকের বিশ্ব ফুটবলের সে গোলাপে মেখে থাকে বিরাট একটা ফুটবল সাম্রাজ্য।








