এ ভাবেও 'বিশ্বজয়' হয়
লুই ফিগোর থেকেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কারণেই কিন্তু এ শহরে পর্তুগালের জন্য এক আলাদা রোম্যান্স তৈরি হয়।

অর্কদ্যুতি রায় (অতিথি লেখক)
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই পাড়ায় পাড়ায় খুদেরা ঝুলিয়েছিল আর্জেন্তিনা, ব্রাজিল, পর্তুগালের পতাকা। সেলেকাও কিংবা আর্জেন্তাইনদের সমর্থক কলকাতায় বহু যুগ ধরেই। কিন্তু পর্তুগাল? লুই ফিগোর থেকেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কারণেই কিন্তু এ শহরে পর্তুগালের জন্য এক আলাদা রোম্যান্স তৈরি হয়।
কলকাতা তার নিজের শহরেই দেখেছে পেলে, মারাদোনা, গুলিট, দুঙ্গা, রজার মিল্লা, রোমারিও, অলিভার কান, ফোরল্যান, দি মারিয়া, এমনকী লিও মেসিকেও। কিন্তু কখনও এ শহরে পা রাখেননি সিআরসেভেন। তা সত্ত্বেও বাঙালি কখন যেন অচিরেই তাঁকে আপন করে ফেলেছে। সবুজ-মেরুন জার্সির কারণে তো মোহনবাগান সমর্থকদের কাছেও 'হার্টথ্রব' ক্রিশ্চিয়ানো।
আসলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো একটা টেম্পারমেন্ট। একটা সেনসেশন। একটা সেলিব্রেশন। আজ থেকে ২৩ বছর আগে যখন দেশের জাতীয় জার্সিটা গায়ে চাপান রোনাল্ডো, তখন বর্তমান পর্তুগাল দলের বহু ফুটবলার জন্মাননি পর্যন্ত। এখন বয়স ৪১। অনেক কটাক্ষ, সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। তিনি উগ্র, তিনি দাম্ভিক, তাঁর ইগো শেষ করল; ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ওই যে, দেশকে একটি বার, অন্তত একটি বার বিশ্বসেরা করে তবেই সবুজ গালিচাকে বিদায় জানাবেন মিস্টার হ্যান্ডসাম। কিন্তু এই ব্রত, প্রতিজ্ঞার জয় হল না শেষ পর্যন্ত। স্প্যানিশ আর্মাদায় চোখের জলে মাঠ ছাড়লেন সিআরসেভেন। ৯০ মিনিট পর্যন্ত পর্তুগীজদের দাঁত চেপে লড়াই। কিন্তু বিধাতার লিখনে যে এদিন বিদায় নিশ্চিত ছিলই ক্রিশ্চিয়ানোর।

Photo-x
একটা সুদীর্ঘ প্রজন্ম ছিল মারাদোনা-আসক্ত। সে দিয়েগো হাত দিয়ে গোল করুন কিংবা নিষিদ্ধ মাদক সেবন করুন। মাঠে মারাদোনা মানে সব ফোকাস ওই ১০ নম্বরেই। বল পায়ে ছুট ছুট ছুট; গোল। আর 'অফ দ্য ফিল্ড' দিয়েগো খালি গায়ে চুরুট মুখে জাহাজের ডেকে। একটা আলাদা 'কেত' ছিল ব্যাপারটাতে। মেসি আবার সে পথে নেই। আদ্যন্ত 'ফ্যামিলি ম্যান' ছেলেটি বন্দিত তাঁর রুচিশীল স্নিগ্ধতার কারণেও। আর পর্তুগীজ স্ট্রাইকার মেসির মতো নন; বরং মেসির অগ্রজকেই যেন একটু বেশি 'ফলো' করেছেন। যত দিন গিয়েছে, তিনি হয়েছেন - বোল্ড, বোল্ডার, বোল্ডেস্ট।
স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, ডেয়ার ডেভিল। হ্যাঁ, রোনাল্ডো মানে কিছুটা 'অ্যারোগ্যান্ট' তো বটেই। আর সেখানেও জিতে ফেরেন লাখ তরুণীর হৃদস্পন্দন। আমাদের অভাগা ফুটবলের যেটুকু যা বেঁচে আছে, তাও ওই মেসি-রোনাল্ডো-নেইমারদের ঘিরেই। মার্কিন মুলুকে নেইমার, রোনাল্ডোর জাতীয় জার্সিতে বিদায় তো হয়েই গেল। তবে ম্যাচশেষে রোনাল্ডো যে ভাবে কাঁদলেন, হয়তো তা দেখে বুক চিরে খান খান স্প্যানিশ তরুণী, যুবতীদেরও।
রোনাল্ডো নিজেই বলেছেন, "Talent without working hard is nothing." ঠিকই। ট্যালেন্ট আর হার্ড ওয়ার্ক; এই দু'য়ের মিশেলেই যে খ্যাতির শিখরে থাকেন ক্রিশ্চিয়ানোরা। বিশ্বকাপ জয় সেই শিরোপার অনুঘটক মাত্র। যে ক্যাটালিস্ট কাউকে স্পর্শ করে। কাউকে করে না। রোনাল্ডো খ্যাতির শীর্ষে থাকা এমনই এক হতভাগ্য। আসলে সিআরসেভেন একটা আর্টওয়ার্ক। বাদশাহী মেজাজে থাকা এমন একজন যিনি অবলীলায় আচ্ছন্ন করেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সাধে কি ডেভিড বেকহ্যাম বলেন, "It was incredible, and every team he played for, he left a legacy for himself."
পাড়ায় পর্তুগালের পতাকাটা হয়তো এবার অবনমিত হবে। তবু থেকে যাবে প্রেম, স্বপ্ন, অধিকার। এখানেই জিতে যায় ফুটবল। জিতে যান রোনাল্ডোরা।
আমার দেশের, আমার শহরের হাজার হাজার ফুটবল খেলিয়ে মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারবে না, এই মুহূর্তে ভারতের ফিফা র্যাঙ্কিং কত। কিন্তু সেই ছেলেগুলি মাঠে নেমে গোল করার পরে সেলিব্রেট করে ক্রিশ্চিয়ানোর ঢঙে। ওই যে, এক একজন সেরা কিছু ছাপ রেখে যান বিশ্ব জুড়ে। রোনাল্ডোর সেলিব্রেশন তেমনই এক স্টাইল স্টেটমেন্ট। তাঁর এক-একটা ড্রিবল, ফ্রি-কিক এর মতোই সুচারু, যাকে আগলে স্বপ্ন দেখে আস্ত একটা সময়কাল। সব বয়সী উন্মত্ত ফুটবলপ্রেমীর দল।
তারা জানতেও চায় না, তাদের স্বপ্নের জাদুকর বিশ্বকাপে ঠোঁট রেখেছেন কিনা। আসলে ওই যে, কিছু কিছু মহাকাব্য, রূপকথার গল্প বিয়োগান্তক হয়। বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদী নায়ক ক্রিশ্চিয়ানোও তেমনই। যাঁর অশ্রুসিক্ত নয়নযুগল ফুটবলকে হয়তো বিদায় জানায়। কিন্তু ফুটবল কখনওই পারে না তার প্রিয়তমকে বিদায় জানাতে। রচিত হয় অপার ভালবাসার নির্মম মহাকাব্য।
এখানেই জয় রোনাল্ডোদের। তাঁরা ম্যাচ হারেন, কিন্তু জেতেন কোটি হৃদয়ের আসক্তি। কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন। রেখে যান একটা সুদীর্ঘ অধ্যায়। এক আসমান অনুভূতি। আনুগত্য।
ফুটবলের প্রতি। ফুটবল নিয়ে বাঁচেন যাঁরা, তাঁদের প্রতি।
যে আনুগত্য সুউচ্চ স্বরে বলে যায়, খ্যাতি আর প্রাপ্তির মাঝেও হয়তো সামান্য একটু ফাঁক থাকে। যেখান দিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তার নিজের ছন্দে লাল কার্পেট বিছিয়ে রাখে। ক্রিশ্চিয়ানো পারেননি সে কার্পেটে পা রেখে লক্ষ্যে পৌঁছতে।
কিন্তু তিনি পেরেছেন আস্ত একটা ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়ে যেতে। ফুটবল থেকে তাঁর বিদায়বেলায়।
সত্যি! এ ভাবেও বিশ্বজয় হয়!








