সোনালি প্রজন্মের আক্ষেপ থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন: আফ্রিকার মঞ্চে আবারও গর্জে উঠেছে আইভরি কোস্ট
আফ্রিকা কাপ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়েই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মাঠে নামে আইভরি কোস্ট।এবার তারা শুধুমাত্র তারকাদের দল নয়; বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী ইউনিট, যারা যে কোনও প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।

এক্সট্রাটাইম ওয়েব ডেস্ক : প্রায় এক দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে প্রতিভাবান দলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আইভরি কোস্ট। দিদিয়ের দ্রোগবা, ইয়ায়া তুরে, কোলো তুরে, সালোমন কালু, জারভিনহো এবং দিদিয়ের জোকোরার মতো কিংবদন্তিদের নিয়ে গড়ে ওঠা "এলিফ্যান্টস" ছিল আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল। ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত টানা তিনটি ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এই দলকে অনেকেই আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রজন্ম হিসেবে বিবেচনা করেন।
কিন্তু এত তারকা সমৃদ্ধ দল হয়েও বড় শিরোপা বারবার হাতছাড়া হয়েছে তাদের।
২০০৬ এবং ২০১২ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (AFCON)-এর ফাইনালে উঠেও যথাক্রমে মিশর ও জাম্বিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা হারায় আইভরি কোস্ট। অন্যদিকে বিশ্বকাপেও তাদের ভাগ্যে জুটেছিল একের পর এক ‘গ্রুপ অব ডেথ’। আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে লড়াই করেও তারা কখনও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি।
অবশেষে ২০১৫ সালে ঘানাকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ১৯৯২ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকা কাপ জিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। তবে সেই সময় দলের অধিকাংশ কিংবদন্তিই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
সোনালি প্রজন্মের বিদায়ের পর শুরু হয় কঠিন অধ্যায়।
এক এক করে কিংবদন্তিদের অবসর নেওয়ার পর তাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে ব্যর্থ হয় আইভরি কোস্ট। ফলে ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিটও হাতছাড়া করে তারা, যা টানা তিনটি বিশ্বকাপে খেলার ধারাবাহিকতার ইতি টানে।
দলে নতুন প্রতিভার অভাব ছিল না, কিন্তু অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিকতা ও দলীয় বোঝাপড়ার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘন ঘন কোচ পরিবর্তনের কারণে দল কখনও স্থিতিশীলতা খুঁজে পায়নি। এরই মধ্যে সেনেগাল, মরক্কো, আলজেরিয়া ও মিশরের মতো দলগুলো আফ্রিকান ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
২০১৯ সালের আফ্রিকা কাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও নতুন কোনও স্বর্ণযুগের ইঙ্গিত তখনও দেখা যায়নি।
২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ছিল আইভরি কোস্টের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো শুরু।
নিজেদের মাটিতে আয়োজিত টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বে ইকুয়েটোরিয়াল গিনির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় তারা। এটি ছিল নিজেদের মাঠে আইভরি কোস্টের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
এই লজ্জাজনক হারের পর প্রধান কোচ জ্যাঁ-লুই গাসেকে বরখাস্ত করা হয়। শেষ ষোলোয় ওঠার ভাগ্য তখন পুরোপুরি নির্ভর করছিল অন্য ম্যাচের ফলাফলের ওপর। একসময় তো মনে হচ্ছিল টুর্নামেন্ট থেকেই বিদায় নিশ্চিত।
কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল হিসেবে শেষ ষোলোয় উঠে আসে আইভরি কোস্ট। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাস।
অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পান দলের সাবেক মিডফিল্ডার এমের্স ফায়ে, যিনি এর আগে সহকারী কোচ ছিলেন।
তার অধীনে শুরু হয় রূপকথার যাত্রা।
শেষ ষোলোয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন সেনেগালকে টাইব্রেকারে হারিয়ে চমক দেখায় আইভরি কোস্ট।
কোয়ার্টার ফাইনালে মালির বিপক্ষে আরও অবিশ্বাস্য নাটকীয়তা দেখা যায়। ম্যাচের শুরুতেই ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও ইনজুরি টাইমে সমতা ফেরায় তারা। এরপর অতিরিক্ত সময়ের ১২২তম মিনিটে জয়সূচক গোল করে ইতিহাস গড়ে এলিফ্যান্টস।
সেমিফাইনালে ডিআর কঙ্গোকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে তারা। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে নাইজেরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের মাটিতে আফ্রিকার সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দলের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার এই গল্পকে অনেকেই আফ্রিকা কাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা প্রত্যাবর্তন বলে মনে করেন।
এই শিরোপা শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং নতুন যুগের সূচনা।
সিমন আদিংরা নিজের গতি ও সৃজনশীলতায় পুরো টুর্নামেন্টে নজর কেড়েছেন। টেস্টিকুলার ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ফুটবলে ফিরে আসা সেবাস্তিয়ান হালের ফাইনালের জয়সূচক গোল তার ব্যক্তিগত সংগ্রামকে আরও অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
মিডফিল্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন ফ্রাঙ্ক কেসিয়ে, রক্ষণভাগে ছিলেন ইভান এনডিকা। পাশাপাশি ওমার দিয়াকিতে, করিম কোনোতে এবং আমাদ দিয়ালোর মতো তরুণ ফুটবলাররা ভবিষ্যতের বড় আশা হয়ে উঠেছেন।
আগের তারকাবহুল দলের তুলনায় এই দলটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলীয় সংহতি, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং ঐক্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
আফ্রিকা কাপ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়েই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মাঠে নামে আইভরি কোস্ট।
এবার তারা শুধুমাত্র তারকাদের দল নয়; বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী ইউনিট, যারা যে কোনও প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।
আফ্রিকা কাপের সাফল্য শুধু একটি ট্রফি এনে দেয়নি, পুরো দেশের ফুটবলে ফিরিয়ে এনেছে আত্মবিশ্বাস এবং আইভরি কোস্টকে আবারও আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আইভরি কোস্টের গল্প শুধু একটি প্রজন্মের জায়গায় আরেকটি প্রজন্মের আগমনের গল্প নয়।
এটি প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র প্রতিভা নয়, সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, ঐক্য এবং ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা। দ্রোগবা ও ইয়ায়া তুরের সোনালি প্রজন্ম বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল, কিন্তু বড় শিরোপার আক্ষেপ রয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে পরবর্তী প্রজন্ম দীর্ঘ সংগ্রামের পর অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ জয় দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে প্রতিভার পাশাপাশি অদম্য মানসিক শক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রোগবা থেকে হালের, ইয়ায়া তুরে থেকে আদিংরা—আইভরি কোস্টের ফুটবল যাত্রা যেন এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে "এলিফ্যান্টস" আবারও আফ্রিকার অভিজাতদের গোত্রে ফিরে এসেছে। এবার তাদের শক্তি শুধু তারকা ফুটবলার নয়, বরং বিশ্বাস, ঐক্য এবং হার না মানা মানসিকতা।








