ব্যর্থতার পাহাড় ডিঙিয়ে আজ দেশের নায়ক, মার্টিনেলির জীবনের হৃদয়স্পর্শী গল্প
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। আর্সেনাল তাকে দলে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। যে ছেলেকে একসময় বড় বড় ক্লাব বারবার ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিই একদিন আর্সেনালের জার্সিতে বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করেন। বাবার স্বপ্ন সফল হল, লড়াই সার্থক।

গরীব বাবার ছেলে দুনিয়া কাঁপানো ফুটবলার হলেন, জীবনের সংগ্রাম একটি অনুপ্রেরণার গল্প বলবে। মার্টিনেলির গল্পটা তেমন ক্লিসে নয়। একজন বাবা বিশ্বাস করতেন, তাঁর ছেলে একদিন ফুটবলার হবে। সেই বিশ্বাসটা ছিল এতটাই প্রবল যে ছেলের জন্মের পর থেকেই তিনি নিজের জীবনের বড় একটি অংশ সেই স্বপ্নের পিছনে ব্যয় করতে শুরু করেন। দামি বুট, উন্নত মানের প্রশিক্ষণের সরঞ্জাম, সেরা কোচ—যা যা দরকার, সবই তিনি জোগাড় করে দিতেন। ছেলের প্রতিভাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে অর্থ, সময় কিংবা পরিশ্রম—কোনও কিছুরই হিসেব রাখেননি তিনি।
তবে একটি প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা থেকে গেছে। ছেলেটি নিজে আদৌ ফুটবলার হতে চেয়েছিল কি না, তা কখনও স্পষ্ট জানা যায়নি। হতে পারে মার্টিনেলি পুলিশ হতে চেয়েছেন, হয়েছেন ফুটবলার, হয়তো চেয়েছিলেন গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে জীবন কাটিয়ে দেবেন কিন্তু হয়ে গেছেন ফুটবলার!
বাবার স্বপ্ন ছিল অটুট। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু হয় বাবা ছেলের দীর্ঘ সংগ্রাম।
ব্রাজিল ছেড়ে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ট্রায়াল দিতে যেতে থাকে ছেলেটি। একের পর এক সুযোগ আসে, আবার একের পর এক প্রত্যাখ্যানও আসে। ইংল্যান্ডের বড় ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে একবার নয়, চারবার ট্রায়াল দিয়েও সুযোগ মেলেনি। স্পেনের বার্সেলোনাতেও একই পরিণতি। ইউরোপের আরও বহু ক্লাব তাকে ফিরিয়ে দেয়।
প্রতিবার ব্যর্থতার সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের কটাক্ষ। অনেকেই বলতে শুরু করেন, এত অর্থ ব্যয় করেও কোনও লাভ হচ্ছে না। একজন কিশোরের জন্য সেই মানসিক চাপ কতটা কঠিন হতে পারে, তা বাইরের মানুষ সহজে বুঝতে পারে না। তবুও বাবা থামেননি। তিনি বিশ্বাস হারাননি। ছেলেও লড়াই চালিয়ে গেছে।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। আর্সেনাল তাকে দলে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। যে ছেলেকে একসময় বড় বড় ক্লাব বারবার ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিই একদিন আর্সেনালের জার্সিতে বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করেন। বাবার স্বপ্ন সফল হল, লড়াই সার্থক।
বিশ্বকাপে জাপানের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র ৪৩ সেকেন্ড আগে তাঁর করা গোলটি শুধু একটি গোল ছিল না। সেটি ছিল বহু বছরের প্রত্যাখ্যান, অপমান, অপেক্ষা আর এক বাবার অদম্য বিশ্বাসের সার্টিফিকেট।
হয়তো সেই বাবার জেদ, সাহস এবং সামর্থ্য না থাকলে মার্টিনেল্লির জীবন অন্য পথে এগোতেনা। তিনি হয়তো অন্য কোনও পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফুটবলারই হলেন—অনেক ব্যর্থতা পেরিয়ে, অসংখ্য দরজা বন্ধ হওয়ার পরও।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম হয়তো সবচেয়ে বড় অক্ষরে লেখা থাকবে না। কিন্তু ফুটবল এমন এক খেলা, যেখানে একজন খেলোয়াড় কখনও কখনও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের হিসেব ছাড়িয়ে সেই আনন্দ তখন হয়ে ওঠে সমষ্টির সম্পদ। কেউ নিজের জীবনের দুঃখ ভুলে কিছুক্ষণের জন্য উল্লাসে মেতে ওঠেন, কেউ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখেন।
সম্ভবত এটাই একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ইতিহাসের পাতায় সেই মুহূর্তের সবটুকু হয়তো লেখা থাকে না। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে, আবেগে আর ভালোবাসায় সেই মুহূর্তগুলো বহুদিন বেঁচে থাকে।








