বাবাকে হারিয়ে চালিয়েছেন উবের, আজ এশিয়ান গেমসে পদকজয়ী সলমন!
সলমনের জীবনে নৌবাইচের কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। ২০১৮ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক গঠন দেখে প্রশিক্ষকেরা তাঁকে নৌবাইচে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রথম দিকে একাধিকবার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রশিক্ষকদের উৎসাহে নৌবাইচের জগতে পা রাখেন তিনি। আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ।

এক্সট্রাটাইম ওয়েবডেস্ক: দিল্লির রাস্তায় উবেরের গাড়ি চালিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া থেকে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে পদক জেতা সলমন খানের জীবনকাহিনি যেন এক রূপকথার গল্প। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল তাঁকে। পরিবারের আর্থিক অনটন মেটাতে একসময় গাড়ির চালকের কাজও করেছেন। অথচ সেই সলমনই আজ এশিয়ান গেমসের মঞ্চে দেশের হয়ে পদক জিতে গর্বিত করেছেন ভারতকে।
২০২৬ সালের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ডাবল স্কালস বিভাগে সতনাম সিংয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন সলমন খান। ৬ মিনিট ১৩.২৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে এই সাফল্য অর্জন করেন তাঁরা। এশিয়ান গেমসে এটিই সলমনের প্রথম পদক। তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ লড়াই, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য মানসিকতা।
সলমনের জীবনে নৌবাইচের কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। ২০১৮ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক গঠন দেখে প্রশিক্ষকেরা তাঁকে নৌবাইচে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রথম দিকে একাধিকবার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রশিক্ষকদের উৎসাহে নৌবাইচের জগতে পা রাখেন তিনি। আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ।
উত্তরপ্রদেশে জন্ম সলমনের। ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার বড়। তাঁর বাবা মহিদ কাসিম খান হরিয়ানায় ট্রাকের কাঠামো তৈরির কাজ করতেন। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি। হরিয়ানাতেই পড়াশোনা শেষ করেন সলমন। সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎই ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়ে বাবার মৃত্যু হয়। তখন সলমনের বয়স মাত্র ১৮ বছর।
সেই বয়সে কলেজে পড়াশোনা করে নিজের স্বপ্ন পূরণের কথা ছিল তাঁর। কিন্তু পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে ছোট ভাইবোনদের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। সংসারের আর্থিক অনটন মেটানোই হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন সাময়িকভাবে পিছিয়ে দিতে বাধ্য হন তিনি।
পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে দিল্লিতে চলে যান সলমন। সেখানে উবেরের গাড়ি চালিয়ে উপার্জন শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন কখনও মন থেকে মুছে যায়নি তাঁর।
এরপর এক বন্ধুর পরামর্শে নতুন করে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সলমন। বন্ধুটি তাঁকে জানান, তাঁর উচ্চতা এবং শারীরিক গঠন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সেই পরামর্শকে সম্বল করেই শুরু হয় নতুন লড়াই। টানা চার মাস কঠোর পরিশ্রমের পর সেনাবাহিনীর নিয়োগ শিবির, শারীরিক পরীক্ষা এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। অবশেষে পূরণ হয় তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন।
কিন্তু সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরেও নৌবাইচের সঙ্গে তাঁর কোনও পরিচয় ছিল না। প্রশিক্ষকেরা তাঁর শারীরিক সক্ষমতা দেখে তাঁকে এই খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। প্রথম দিকে বারবার অনীহা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রশিক্ষকদের কথায় নৌকায় ওঠেন সলমন।
প্রথম আন্তঃকেন্দ্র প্রতিযোগিতাতেই রুপোর পদক জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে তাঁর। এরপর ২০২১ সালে প্রয়োজনীয় এরগোমিটার পরীক্ষায় নির্দিষ্ট মান অর্জন করে পুনের সেনাবাহিনীর নৌবাইচ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সুযোগ পান তিনি। যদিও এই খেলায় দু’বার প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সলমন। কিন্তু প্রশিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং নিজের জেদ তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে নৌবাইচের জগতে।
এরপর ধীরে ধীরে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। ২০২২ সালে গুজরাটে অনুষ্ঠিত ৩৬তম জাতীয় গেমসে সোনা জেতেন সলমন। ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের লুসানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নৌবাইচ কাপের তৃতীয় প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। একই বছরে জায়গা করে নেন টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম প্রকল্পেও।
২০২৪ সালে এশিয়ান রোয়িং কাপে সোনা জিতে আরও একবার নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন সলমন। এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নায়েব সুবেদার পদে উন্নীত হন তিনি। এরপর ২০২৫ সালে অস্ট্রেলীয় নৌবাইচ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং এশিয়ান নৌবাইচ চ্যাম্পিয়নশিপে রুপোর পদক জেতেন।
আর এবার ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে সতনাম সিংয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে ব্রোঞ্জ জিতে নিজের সাফল্যের মুকুটে যোগ করলেন আরও একটি পালক।
একসময় যে খেলায় অংশ নিতেই রাজি ছিলেন না, আজ সেই নৌবাইচই তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য। দিল্লির রাস্তায় পরিবারের জন্য গাড়ি চালানো থেকে এশিয়ান গেমসের পদকজয়ী হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক না কেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম এবং সঠিক দিশা জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।








