আরও একবার চলো ফিরে যাই
তাই আজ ফুটবল বিধাতার কাছে গোটা বিশ্বের আকুল আকুতি, হোক আর একবার।

অর্কদ্যুতি রায়
ছেলেবেলায় ইস্কুলে রেজাল্ট খারাপ হলে মা বলত, "মন খারাপ করিস না। অন্ধকারের পিছনে ঠিক আলো থাকে।"
সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই মেটলাইফ স্টেডিয়াম। হয়তো সেই আবার একটা অবসর। শুধু মাঝে পড়ে আছে দশ-দশটা বছর। একরাশ অপমান, চরম ব্যর্থতাকে কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে নবউদ্যমে আকাশ ছোঁয়ার অঙ্গীকার। জাতীয় প্রাপ্তির প্রেক্ষিতে কিছু না পাওয়ার আক্ষেপকে মলিন করে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে ওঠার সংগ্রাম। ঈশ্বর একে একে সব দিয়েছেন। আসলে সাধনা ঋজু রেখে শুধু প্রতীক্ষায় বিশ্বাস করতে হয়।
২৬ জুন, ২০১৬ থেকে ১৯ জুলাই, ২০২৬; একটা দশ বছরের ল্যাপে ঈশ্বর কতকিছুই না দেখালেন তাঁর সাধককে। নাহলে দুঃসময়ের গ্লানি থেকে অবসর, ফের কোপাজয়, বিশ্বজয় - জীবন এমনই। ওই যে, অন্ধকারের পিছন হতে আলোকমালায় সেজে ওঠা।
সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, তিন বার জয়। তিন বার হার। চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালের হিসেব নিকেষ করার সময় হয়নি এখনও। তবে এর আগে মোট ছয় বার ফাইনাল খেলেছে আর্জেন্তিনা। আর লিও মেসি খেলেছেন দু'টি ফাইনাল। ২০১৪ এবং ২০২২। আমাজনের দেশে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। কিন্তু এশিয়া নিরাশ করেনি ফুটবলের বরপুত্রকে। কাতারে বিশ্বজয়ের স্মারকে ঠোঁট ছুঁয়ে পেয়েছেন নৈসর্গিক স্বাদ।
সম্প্রতি ফিফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবার নিলামে তোলা হবে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্তিনা - ইংল্যান্ড ম্যাচের বল। মারাদোনার 'হ্যান্ড অব গড'-এর সেই ঐতিহাসিক বল। এই মাসের শেষেই প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে শুরু হবে এই নিলাম। বছর চারেক আগে মারাদোনার ১৯৮৬-র ওই ম্যাচের জার্সি নিলাম হয়েছিল। রেকর্ড অর্থ - ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি হয় সেই জার্সি।
লিও মেসিরও এমন শতাধিক মুহূর্ত আছে। সেইসব সামগ্রীও হয়তো একে একে নিলামে তুলবে ফিফা। সে সব চলতে থাকবে কালের নিয়মে। কিন্তু যা থেমে যাবে, তা কি আর ফিরে পাওয়া যাবে?
আজ আর কোনও ফুটবলীয় কচকচানি নয়। স্প্যানিশ ডিফেন্স ভাঙতে ফুটবলের বরপুত্র ঠিক কোন পজিশনে খেলবেন? রাইট উইং থেকে বারবার ইনসাইড করে বিপক্ষের রক্ষণে ঠিক কতটা ফাঁক তৈরি করবেন; এ সব তো অনেক হল! আজ মেসিময় হোক ফুটবল। আজ মেসিময় হোক একটা বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম মহারণ। আজ আকাশী-সাদা, লাল-হলুদ - সব রং মেসিময় হোক। আজ বিশ্ব ফুটবলের সব আনন্দ-গ্লানি মেসিময় হোক। আজ ভারত-পাকিস্তান, রাশিয়া-ইউক্রেন, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন, আমেরিকা-ইরান; তিক্ততা ধুয়ে মুছে সব সব সব বোধ হোক মেসিময়। আজ মেসিময় হোক - আ লাস্ট গোল। আ লাস্ট ডান্স।
এই মুহূর্তে অদ্ভুত এক সন্ধিক্ষণে লিও মেসিকে দাঁড় করিয়েছেন ফুটবল দেবতা। একদিকে সেই স্পেন যে ছোট্ট লিওর 'গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি'-কে জয় করার পথ বাতলেছিল। সেই স্পেন যে শূন্য থেকে তুলে এনে এক মহাকাশ সিদ্ধিলাভের চাদর জড়িয়েছিল মেসির সর্বাঙ্গে, আজ তার সঙ্গে মাতৃভূমির অপার অনুভূতির ধর্মযুদ্ধ। খানিকটা যেন শিখর বনাম শিকড়ের যুদ্ধ!
আসলে আমরা যারা বিশ্ব ফুটবলের সবুজ গালিচা থেকে আলোকবর্ষ দূরে, তারা এসব নিয়ে ভাবি। হয়তো বা একজন আদ্যন্ত প্রফেশনালের কাছে জার্সিটাই সব। যে জার্সি পরে মাঠে নামবেন, মুষ্টিবদ্ধ হাতে দিগন্ত দূরের স্বপ্নে মোড়া সেই সাফল্য স্পর্শ করাই হবে লক্ষ্য, জেদ। এক বুক অঙ্গীকার মিশে থাকে সেই মাতৃভূমির ঋণ ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রামে।
আমরা এমন এক দেশে থাকি যেখানে ফুটবলীয় আবেগ দীপ্তিময়। কিন্তু প্রাপ্তির প্রদীপ জ্বলে কদাচিৎ। আমরা কালেভদ্রে বন্ধুকে ডেকে চায়ের ঠেকে বলি, আমাদের এক ভাইচুং ছিল। একটা ছেত্রী ছিল। বাবা-কাকারা বলেন, আমাদের একটা পিকে-চুনী-বদ্রু ছিল। একটা শ্রেণির গর্ব, আমাদের এক আকবর, থঙ্গরাজ, সুভাষ, সুব্রত, কৃশানু, বিকাশ ছিল। হায় রে ভাগ্য! আমরা 'ছিল'-তেই থাকলাম। যখন গোটা বিশ্ব বুক চিতিয়ে বলে, আমার একটা মেসি আছে।
আজ হয়তো সেই রাত, যখন সেই 'আছে'-টা অতীত হওয়ার পথে। সবুজ গালিচায় বিশ্বকাপের অন্তিম যুদ্ধের অব্যবহিত পরে লিও মেসির কী ঘোষণা থাকবে জানা নেই। চল্লিশ ছুঁইছুঁই একটা দীর্ঘ যাত্রাপথের যবনিকা পড়বে? নাকি আরও একটু সাধনার রং শরীরে লেপ্টে এগোবেন উঁচুতে আরও উঁচুতে ওঠার পথে? জানা নেই। সত্যি, জানা নেই।
কিন্তু জানি, জীবন তো চলবেই। আমরা লড়াই করব বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে যদি একটু উঁচুতে ওঠা যায়। আমরা ফের ব্রাজিল-আর্জেন্তিনা দ্বৈরথে তর্ক জুড়ব। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে টক শো করব। অলিম্পিক্সে একটা পদকের জন্য হা হুতাশ করব। আবার বিশ্ব ফুটবলের আগামী প্রজন্মের তারকাকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরাব।
কিন্তু সবুজ গালিচার একটা অধ্যায়কে হারিয়ে ফেলব চিরতরে। তাঁর ড্রিবল, ফ্রি-কিক, টাচ-পাস, গোল, সেলিব্রেশন, কান্না - হারিয়ে ফেলব চিরতরে।
তাই তো আর একবার। হয়তো শেষবার। আজ শুধু অনুভবের রাত। লিও মেসি আজ জিতুন, হারুন। গোল করুন, না করুন। সোনার বুট পান, না পান। বিশ্বকাপের মাথায় ঠোঁট রাখুন, না রাখুন। সাফল্যের আবির মেখে সেলিব্রেট করুন, না করুন। আজ সবকিছু মেসিময়। আজ হয়তো মহাকাশের ওপারে দিয়েগো নামক দ্রোণাচার্যের সব ইন্দ্রিয় মেসিময়।
তাই আজ ফুটবল বিধাতার কাছে গোটা বিশ্বের আকুল আকুতি, হোক আর একবার।
হয়তো শেষবারের জন্য -
A last goal.... A last dance....
