অর্টিজম আক্রান্ত ছেলের জন্যই খোলা চুলে মাঠে নামেন কুকুরেয়া: তারকার আবেগঘন গল্প
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেনের তারকা ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার নাম এখন ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে। নেপথ্যে সেই চুল না বাঁধার কাহিনী। তবে এই গল্প খুবই হৃদয় বিদারক।
এক্সট্রা টাইম বাংলা ওয়েব ডেস্ক:
মহাভারতে চুল না বাঁধার পণ করেছিলেন দ্রৌপদী। পাশা খেলার লড়াইয়ের দিন, দুঃশাসনের অপমানের জ্বালা জুড়াতে দ্রৌপদীর পণ ছিল, দুঃশাসনের রক্তে চুল ধুয়ে বেণী বাঁধবেন তিনি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সেই কথা রেখেছিলেন ভীম।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেনের তারকা ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার নাম এখন ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে। নেপথ্যে সেই চুল না বাঁধার কাহিনী। তবে এই গল্প খুবই হৃদয় বিদারক।
আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দে যখন মেতে উঠেছে গোটা স্পেন, তখন কুকুরেয়ার ব্যক্তিগত জীবনের এক আবেগঘন গল্পও সামনে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ, কোঁকড়ানো চুল শুধু তাঁর স্বতন্ত্র স্টাইলের পরিচয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর অটিস্টিক ছেলে মাতেওকে ঘিরে এক গভীর আবেগ।
জানা যায়, ম্যাচের সময় কুকুরেয়া চুল খোলা রাখেন, যাতে তাঁর ছেলে মাতেও গ্যালারি বা টেলিভিশনের পর্দায় বাবাকে সহজে চিনতে পারে। কেন এর কারণই বা কী ? বাবাকে হাজারের ভিড়ে কেনই বা চিনবেননা ছেলে? ছোট্ট এই বিষয়টিই ফুটবলের সঙ্গে তাঁর পিতৃত্বের সম্পর্ককে আরও আবেগঘন করে তুলেছে। আসলে টিভিতে বা মাঠে বসে খেলা দেখার সময় ছোট্ট ছেলেটির তার বাবাকে চিনতে অসুবিধা হয়। তাই ছেলের জন্যেই বড় চুল রেখেছেন, আর চুল না বেঁধে অনেকের মধ্যে আলাদা করে তোলেন, স্পেনের তারকা। ভাবতে পারছেন, মাঠে উপস্থিত লাখো দর্শক, টেলিভিশনে চোখ রাখা কোটি কোটি সমর্থক ফুটবল লাভার নয়, কুকুরেয়া একজনের জন্যেই ফুটবল খেলেন। চুলটা আলাদা করে নিয়েছেন। যাতে প্রিয় সন্তান তাকে চিনতে পারে।
এক সাক্ষাৎকারে এবং ‘Married to the Game’ নামের তথ্যচিত্রে নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কুকুরেয়া। মাতেওর কথা বলতে গিয়ে চোখে জল চলে আসে তাঁর। স্পেনের এই ডিফেন্ডার জানান, সন্তানের অটিজম ধরা পড়ার পর কোনও বাবা-মাই আসলে সেই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকেন না।
“আপনার সন্তান অটিস্টিক, এটা জানার পর বাবা-মায়েরা কী করবেন, তার জন্য প্রস্তুত থাকেন না। আমাদের সবকিছু একেবারে শূন্য থেকে শিখতে হয়েছে,” বলেন কুকুরেয়া।
স্কুলে গিয়ে কাঁদত ছেলে
মাতেওর বেড়ে ওঠার পথ সহজ ছিল না। মূলধারার একটি স্কুলে পড়ার সময় অনেক দিনই সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরত। কখনও কখনও স্কুলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে হত।
কুকুরেয়ার সঙ্গী ক্লদিয়া রদ্রিগেজ জানান, সেই সময় পরিস্থিতি তাঁদের জন্যও অত্যন্ত কঠিন ছিল। সকালে মাতেওকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় অনেক দিনই তাঁরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারতেন না।
মাতেওর অটিজম ধরা পড়ার পর পরিবার পড়ে সমস্যায়। ছেলের প্রয়োজন, আচরণ এবং পরিস্থিতি বোঝার জন্য তাঁদের নিজেদেরই অনেক কিছু শিখতে হয়েছে।
প্রতিটি সিদ্ধান্তে মাতেওর কথা ভাবেন পরিবার
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাতেওর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবারের জীবনযাত্রায়ও নানা পরিবর্তন এসেছে। কোথায় থাকা হবে, কোন স্কুলে পড়বে, চিকিৎসা ও থেরাপির সুবিধা কেমন, এমনকি ছুটি কাটাতে কোথায় যাওয়া হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারকে ভেবে দেখতে হয়, তা মাতেওর জন্য কতটা উপযুক্ত।
বিশেষ করে বাইরে যাওয়ার সময়, অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে ওঠে। নতুন জায়গা, বদলে যাওয়া রুটিন এবং একসঙ্গে একাধিক পরিবর্তন মাতেওর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই পরিচিত পরিবেশ এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় পরিবার।
এমনকি কুকুরেয়ার ফুটবল কেরিয়ারের ক্ষেত্রেও পরিবারের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনও ক্লাব তাঁকে সই করাতে আগ্রহ দেখালে, প্রথমেই দেখা হয় সেই এলাকায় মাতেওর জন্য উপযুক্ত স্কুল এবং প্রয়োজনীয় থেরাপির সুযোগ রয়েছে কি না।
“আমার পরিবার ভালো থাকলে আমিও মাঠে নিজের সেরাটা দিতে পারি,” বলেছেন কুকুরেয়া।
‘মাতেও আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে’
কুকুরেয়া এবং ক্লদিয়ার আরও দুই সন্তান আছে, রিও এবং বেলা। তবে মাতেও তাঁদের জীবনকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শিখিয়েছে বলে জানান তাঁরা।
কুকুরেয়ার কথায়, মাতেওর ছোট্ট কোনও অগ্রগতিও তাঁদের কাছে বিশাল আনন্দের বিষয়।
“একটি ছোট পদক্ষেপও অন্য যেকোনও কিছুর চেয়ে বেশি আনন্দ দেয়,” বলেন স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ডিফেন্ডার।
মাতেওকে নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার মাধ্যমে অন্য অটিস্টিক শিশুদের বাবা-মায়েদেরও সাহস ও সমর্থন দিতে চান কুকুরেয়া। তাঁর কথায়, মাতেও তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছে, অসীম আনন্দ এনে দিয়েছে এবং পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর কুকুরেয়ার সাফল্যের গল্প তাই শুধু মাঠের নয়। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে স্পেনের উল্লাসের আড়ালে রয়েছে এক বাবার লড়াই, ভালোবাসা এবং নিজের সন্তানের জন্য প্রতিদিন নতুন করে শেখার গল্প।
