Footballer Rupak Chowdhury
By Admin·6 views

রূপক চৌধুরী – নামটা ময়দানে অপরিচিত নয়। ছোট দলে যেমন চুটিয়ে খেলেছেন, তেমনি বড় দলের জার্সিও গায়ে উঠেছে। তবে তি্নি ছিলেন একটু অন্যরকম ফুটবলার। কেন অন্যরকম? আসলে মাঠে আচরণ, বাইরে ব্যবহার, জীবনযাত্রা, ভাবমূর্তিতে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে চেনা যেত রূপক চৌধুরীকে। মাঠে খারাপ আচরণ? গণ্ডগোল? নৈব নৈব চ। এর পিছনে অবশ্য একটা মনে রাখার মত গল্প আছে।
বারুইপুর লিগ থেকে উঠে এসেছিলেন হরিনাভির রূপক। শোনা যায়, তখন ওই লিগে রুপক ছিলেন অনেক বড় আকর্ষণ। তাঁর খেলা দেখার জন্য অনেক দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন। তাঁর জন্যই ৫০০ – ১০০০ দর্শক বেশি হত তাঁদের ম্যাচে। সেই সময়েই ঘটেছিল ঘটনাটা।

শুরুর দিকে রূপকও ছিলেন আর পাঁচ জনের মতই। বডি কনট্যাক্ট গেমে কখনও কখনও তাঁরও মাথা গরম হত। সেই রকমই একটি ম্যাচে তিনি দুটি গোল করেছিলেন। তারপর তাঁর একটি ন্যায্য গোল বাতিল করেন রেফারি। তখনই মাথা গরম করে রেফারির সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেন। বলেন কিছু কটু কথা। রূপকের নিজের কথায়, ম্যাচ শেষে এক বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁকে ডেকে খেলার জন্য প্রশংসা করার পরই বলেন, “আমরা তোমার খেলা দেখার জন্য বহু দূর থেকে ছুটে আসি। তোমার মাথা গরম দেখার জন্য নয় বা তোমার খারাপ কথা শোনার জন্য নয়। খারাপ কথা বলে তুমি কি রেফারির সিদ্ধান্ত বদলাতে পারলে?” রূপক জানালেন, এই ঘটনাই তাঁকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। তারপরই নাকি তিনি নিজেকে বদলাতে শুরু করেন। এটা অবশ্য একদিনে হয়নি। তবে তারপরই ক্রমশ নিজেকে অন্যরকমভাবে গড়ে তোলেন, জানালেন রূপক।
সেই রূপক ওই ঘটনার পর খেলার পাশাপাশি নিজের আচরণ, ভাবমূর্তিকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান, যে বারুইপুর বা তার আশেপাশের অঞ্চলে সত্যিকারের হিরো হয়ে ওঠেন। হিরো হয়ত ছিলেন, তারপর অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন। রূপকের তৃপ্তি, “হয়ত এজন্যই আজও মানুষ আমাকে এত ভালবাসে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী আছে। আমি বিশ্বাস করি তুমি যাই কর, জীবন দর্শনটা ঠিক থাকা খুব জরুরি। সংযমী হতে হয়। শৃঙ্খলা থাকতে হয়।“ সে কারণেই নইমুদ্দিনের শৃঙ্খলা তাঁকে আলাদাভাবে টানত। একটা উদাহরণও দিলেন, সুনীল গাভাসকর তাঁর লেখা বইয়ে আইডল হিসাবে রথী মহারথীদের পাশে রেখেছিলেন পদ্মকর শিভলকর ও রাজিন্দর গোয়েলকে। রূপকের প্রশ্ন, “ওই দুজন মহাতারকা না হলেও তাঁদের মধ্যে এমন কী ছিল, যা গাভাসকর মনে করেছিলেন?” এই মন্তব্যের মধ্যেই যেন নিজেকে ধরা দিলেন রূপক চৌধুরী।
এমন কী এখনও ভাল কাজের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। বন্ধু, খেলোয়াড় বন্ধুদের সহযোগিতায় ও নিজের সামর্থ্যে তিনটি এনজিও চালাচ্ছেন। ২৪০ জন অনাথ ছেলে মেয়ের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন। আজকের প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে তাঁর অনুরোধ, “খেপের মাঠে যেও না। প্রলোভোন থেকে দূরে থাকো।“ তারপরই অবশ্য বললেন, “হয়ত ওদেরও যুক্তি আছে। বলবে আপনাদের সময়ে খেলে চাকরি ছিল। এখন সংসার চালানোর জন্য খেপের মাঠে এত বেশি যেতে হচ্ছে। সত্যিই আক্ষেপ করা ছাড়া উপায় কী?” তবে এখন সেভাবে বাঙালি ফুটবলার উঠে না আসার জন্য তিনি ফুটবলারদের দায়ি করতে চান না বরং তাঁ প্রশ্ন, বড় ক্লাব তো বটেই, ছোট ক্লাবেও কেন এখন এত বেশি ভিন রাজ্যের ফুটবলারদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? কেন বাঙালি ফুটবলারদের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকছেন বেশিরভাগ কোচই?
সব শেষে রূপক জানিয়ে দিলেন, ফুটবল খেলে যেটুকু পেয়েছেন, তাতেই তিনি খুশি। কারও বিরুদ্ধে তাঁর কোনও অভিযোগ নেই। এখনও যে মানুষ তাঁকে চিনতে পারে, এখনও যে এসে বলে, বড় দলে প্রতিষ্ঠিত অনেক ফুটবলারের চেয়েই তিনি অনেক ভাল ফুটবলার ছিলেন – এটাই তাঁর প্রাপ্তি। হয়ত এটাই তাঁর সান্ত্বনা। তিনি কি অভিমানী? না, অভিমান থাকলেও তা একবারের জন্যও বোঝা গেল না। আসলে ওই যে, ফুটবলার রূপক চৌধুরী মানুষ হিসাবেও যে আলাদা। অন্যরকম। অনুকরণীয়।
